এভাবেই শহরটির নাম হয়েছিল বস্টন

ইংল্যান্ডের বস্টন এবং ম্যাসাচুসেটসের বস্টনের মধ্যকার সম্পর্কটি উত্তর আমেরিকায় ইংরেজ অভিবাসনের ইতিহাসের একটি আকর্ষণীয় অধ্যায়। এই দু’টি স্থানের মধ্যে কেবল নামের মিলই নেই বরং সপ্তদশ শতাব্দীর ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মাধ্যমে এরা একে অপরের সাথে যুক্ত। সেই সময়ে ইংরেজ বসতি স্থাপনকারীরা আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এমন সব জনবসতি গড়ে তুলেছিলেন, যা পরবর্তীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে ওঠে।
🔵 ১৬৩০ সালে ইংল্যান্ডের লিঙ্কনশায়ারের বস্টন শহরের নামানুসারে ম্যাসাচুসেটসের বস্টনের নামকরণ করা হয়। ইংল্যান্ডের এই শহরটির সাথে সেই পিউরিটান বসতি স্থাপনকারীদের গভীর সম্পর্ক ছিল যারা ম্যাসাচুসেটসে বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছিলেন। তবে, ম্যাসাচুসেটসের বস্টনে আসা প্রথম দিকের সকল বা অধিকাংশ মানুষ যে সরাসরি ইংল্যান্ডের সেই শহর থেকেই এসেছিলেন তা বলাটা সঠিক হবে না। এই অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ইংল্যান্ডের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ যুক্ত ছিলেন। আর এই নতুন বসতির নামকরণের বিষয়টি বিশেষভাবে রেভারেন্ড জন কটন এবং তাঁর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কিত।
🔵 ইংল্যান্ডের বস্টন হলো দেশটির পূর্ব উপকূলে অবস্থিত লিঙ্কনশায়ারের একটি ঐতিহাসিক বাজার ও বন্দর শহর। এখানকার সবচেয়ে পরিচিত নিদর্শন হলো সেন্ট বটলফস চার্চ (St. Botolph’s Church) যার বিশাল মিনারটি ‘বস্টন স্টাম্প’নামে পরিচিত।
🔵 সপ্তদশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বস্টন ছিল বাণিজ্য ও ধর্মীয় জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানকার বাণিজ্যিক যোগাযোগ, বিত্তশালী বণিক শ্রেণি এবং শিক্ষিত বাসিন্দারা একে এমন এক বৃহত্তর ইংরেজ জনপদ নেটওয়ার্কের অংশ করে তুলেছিল যেখানে ধর্ম ও গির্জা সংস্কার নিয়ে নানা বিতর্ক চলত।
🔵 রাজা প্রথম চার্লসের শাসনামলে (যিনি ১৬২৫ সালে ইংল্যান্ডের সিংহাসনে আরোহণ করেন) শহরটির ধর্মীয় গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। ‘পিউরিটান’ নামে পরিচিত অনেক ইংরেজ প্রোটেস্ট্যান্ট ‘চার্চ অভ ইংল্যান্ড’-এ সংস্কার আনতে চেয়েছিলেন। তারা গির্জার এমন সব প্রথা বিলুপ্ত করতে চেয়েছিলেন যা তাদের কাছে অতিরিক্ত আচারসর্বস্ব বলে মনে হতো অথবা যেগুলোর কোনো শক্ত ভিত্তি পবিত্র ধর্মগ্রন্থে ছিল না।
🔵 সব পিউরিটান আবার একই মতাদর্শের ছিলেন না। কেউ কেউ গির্জার কাঠামোর ভেতরে থেকেই সংস্কার আনতে চেয়েছিলেন, আবার কেউ কেউ মনে করতেন যে আরও আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজন। গির্জা কর্তৃপক্ষের সাথে তাদের মতপার্থক্য ১৬২০ ও ১৬৩০-এর দশকে ক্রমশ আরও গুরুতর আকার ধারণ করে।
🔵 লিঙ্কনশায়ারের বস্টনে পিউরিটান মতাদর্শের শক্তিশালী প্রভাব গড়ে উঠেছিল বিশেষ করে সেখানকার বিখ্যাত ধর্মযাজক রেভারেন্ড জন কটনের নেতৃত্বে। তিনি একজন পণ্ডিত ও প্রভাবশালী পিউরিটান প্রচারক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ১৬৩৩ সালে কটন ইংল্যান্ড ত্যাগ করেন এবং ম্যাসাচুসেটসের বস্টনে একজন শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। কটন এই ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কারণ তাঁর ধর্মপ্রচার এমন একটি ধর্মীয় সম্প্রদায় গড়ে তুলতে সাহায্য করেছিল যার সদস্য ও সহযোগীরা পরবর্তীতে নিউ ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান।
🔵 সেন্ট বটলফস-এ, কটন এমন মানুষদের আকৃষ্ট করেছিলেন যারা তাঁর ধর্মোপদেশকে গুরুত্ব দিতেন এবং তাঁর মতোই ধর্মীয় সংস্কারের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন। তাঁর প্রভাব কেবল বস্টন শহরেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং পার্শ্ববর্তী লিঙ্কনশায়ার অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
🔵 তবে কটনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে ইংরেজ চার্চ কর্তৃপক্ষের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে। পিউরিটান ধর্মপ্রচারকদের ওপর চাপ বাড়তে থাকায় তিনি আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। ১৬৩৩ সালে তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে ‘গ্রিফিন’নামক জাহাজে করে ইংল্যান্ড ত্যাগ করে ম্যাসাচুসেটসের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে তিনি বস্টনের একটি চার্চের ধর্মযাজক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৬৫২ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে টিকে থাকেন।
🔵 কটন ইংল্যান্ড ও আমেরিকার জনপদগুলোর মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরিতে সহায়তা করেছিলেন তবে এই স্থানটির নামকরণের যে নথিপত্র পাওয়া যায় তা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে কেবল তাঁর সম্মানেই এর নাম রাখা হয়েছিল।
🔵 ম্যাসাচুসেটসের বস্টন শহর প্রতিষ্ঠার পেছনে যে অভিবাসন প্রক্রিয়া কাজ করেছিল তা ছিল ‘গ্রেট মাইগ্রেশন’ নামক একটি বৃহত্তর আন্দোলনের অংশ বিশেষ করে ১৬২০ থেকে ১৬৪০ সালের মধ্যে ইংল্যান্ড থেকে নিউ ইংল্যান্ডে আসা অভিবাসীদের ঢেউ।
🔵 পিউরিটানরা এমন সব জনপদ গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন যেখানে তাঁরা নিজেদের মতো করে খ্রিস্টধর্ম পালন করতে পারবেন।
🔵 অনেক ধর্মপ্রচারক ও তাঁদের অনুসারীরা তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের কারণে নানা বিধিনিষেধ, শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বা অন্যান্য চাপেরও সম্মুখীন হয়েছিলেন।
দি ম্যাসাচুসেটস বে এন্টারপ্রাইজ বসতি স্থাপনকারীদের এমন সুযোগ করে দিয়েছিল যার মাধ্যমে তারা নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী চার্চ, শহর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারতেন।
🔵 পাশাপাশি ব্যবসায়ী, কৃষক, কারিগর এবং বিভিন্ন পরিবার জীবিকা, জমি, আত্মীয়স্বজন এবং নিজেদের সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেও এই যাত্রায় শামিল হয়েছিল।
১৬২৯ সালে রাজকীয় সনদের ভিত্তিতে গঠিত ‘ম্যাসাচুসেটস বে কোম্পানি’এই ঔপনিবেশিক উদ্যোগটির আয়োজন করেছিল। ১৬৩০ সালে এগারোটি জাহাজের একটি বহর শত শত অভিবাসীকে নিয়ে নিউ ইংল্যান্ডে পৌঁছায়; এগুলোর মধ্যে ‘আরবেলা’নামক জাহাজটিতে ছিলেন কলোনির জন্য মনোনীত গভর্নর জন উইনথ্রপ।
🔵 এই বসতি স্থাপনকারীরা সবাই যে লিঙ্কনশায়ারের বস্টন শহর থেকে এসেছিলেন তা নয়; তারা ইংল্যান্ডের বিভিন্ন কাউন্টি থেকে এসেছিলেন, তবে লিঙ্কনশায়ার এবং এর আশেপাশের পিউরিটান নেটওয়ার্ক এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
🔵 ইংরেজরা এখানে বসতি স্থাপনের আগে, উপদ্বীপটি তাদের কাছে ‘শামুট’ (Shawmut) নামে পরিচিত ছিল। জায়গাটিতে আগে থেকেই আদিবাসী জনগোষ্ঠী -যার মধ্যে ম্যাসাচুসেট ভাষাভাষী সম্প্রদায়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল -বসবাস করত এবং তারা এই অঞ্চলটি ব্যবহার করত।
🔵 উইলিয়াম ব্ল্যাকস্টোন নামে একজন ইংরেজ যাজক, যিনি স্বাধীনভাবে সেখানে বসতি স্থাপন করেছিলেন, পিউরিটানদের বৃহত্তর অভিবাসী দল পৌঁছানোর সময় সেই উপদ্বীপে বসবাস করছিলেন।
🔵 ১৬৩০ সালে, জন উইনথ্রপের নেতৃত্বাধীন বসতি স্থাপনকারীরা ওই এলাকায় একটি বড় ইংরেজ ঔপনিবেশিক বসতি গড়ে তোলেন।

১৬৩০ সালের ৭ই সেপ্টেম্বর, ম্যাসাচুসেটস জেনারেল কোর্ট নির্দেশ দেয় যে, যে স্থানটি আগে ‘ট্রাইমাউন্টেইন’(Trimountaine) নামে পরিচিত ছিল, তার নাম এখন থেকে রাখা হবে ‘বস্টন’(Boston)।
🔵 এই নামটি রাখা হয়েছিল লিঙ্কনশায়ারের বস্টন নামক ইংরেজ শহরটির সম্মানে। নতুন উপনিবেশের পিউরিটান নেতা ও বসতি স্থাপনকারীদের সাথে এই শহরটির গভীর সম্পর্ক ছিল। উপনিবেশটির অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব থমাস ডাডলি সেই ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ছিলেন যারা এই নামকরণের সিদ্ধান্তের সাথে যুক্ত ছিলেন।
🔵 সুতরাং, এই নামটি শুধু একটি ভৌগোলিক নির্দেশক ছিল না, এটি বহন করত বসতি স্থাপনকারীদের ফেলে আসা আবাসভূমির স্মৃতি, তাদের ধর্মীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সেই সামাজিক সম্পর্কগুলোর কথা যা তাদের আমেরিকায় আসার পেছনে ভূমিকা রেখেছিল।
🔵 এটিও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই ইংরেজি নামটি এই অঞ্চলের ইতিহাসের সূচনা নির্দেশ করে না। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকীকরণের অনেক আগে থেকেই এই উপদ্বীপে এবং এর আশপাশের এলাকায় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল।
সংবাদটি আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন
গুরুত্বপূর্ণ এই সংবাদটি অন্যদের জানাতে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করুন।